সাংবাদিকতায় আমার পথচলা:এক সাহসী পদক্ষেপ থেকে সম্পাদক হওয়ার গল্প
- আপডেট সময় : ১২:২১:১৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ ৭৬ বার পড়া হয়েছে
আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুটা প্রায় ২০০৫ সালের দিকে। তখন প্রায়ই চাঁদপুরে আমার মামার বাসায় বেড়াতে যেতাম। আমার মামা, জামাল হোসেন চৌধুরী, চাঁদপুর হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন। সে সময় তাঁর বাসা ছিল চাঁদপুর শহরের তালতলায়।
একদিন ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ল দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ পত্রিকার সাইনবোর্ড। কৌতূহল আর সাহস নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। ওয়েটিং রুমে বসে ছিলেন পত্রিকাটির প্রধান ফটোগ্রাফার বাদল মজুমদার। সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম এবং জানতে চাইলাম, আমার লেখা ছড়া-কবিতা প্রকাশের সুযোগ হবে কি না।তিনি আন্তরিকভাবে বললেন, “ভেতরে যান, আল ইমরান শোভন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলুন।”
তখন আল ইমরান শোভন ভাই পত্রিকার মফস্বল সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর সঙ্গে পরিচয় দিয়ে বললাম, আমার বাড়ি মতলব দক্ষিণ উপজেলায়। মামার পরিচয় শুনেই তিনি বললেন, “জামাল হোসেন চৌধুরী স্যারকে আমি ভালো করেই চিনি। তিনি খুব ভালো মানুষ।”
আমি তাঁকে জানালাম, আমি নিয়মিত ছড়া-কবিতা লিখি এবং মতলব দক্ষিণ থেকে সংবাদ পাঠাতে চাই। তিনি জানালেন, সেখানে ইতোমধ্যে শওকত আলী ভাই ও গোলাম হায়দার মোল্লা কাজ করছেন। তখন আমি বললাম, মতলবের পূর্বাঞ্চল-নারায়ণপুর, নায়েরগাঁও উত্তর-দক্ষিণ এবং খাদেরগাঁও এলাকার সংবাদ আমি নিয়মিত পাঠাতে পারব। তিনি হাসিমুখে বললেন, “ঠিক আছে, আপনি সংবাদ পাঠাতে থাকুন। তবে প্রতিনিধি হওয়ার জন্য একটি আবেদনপত্র লিখে দিন।”
মামার বাসায় ফিরে পুরো বিষয়টি তাঁকে জানালাম। আবেদনপত্র আমি নিজেও লিখতে পারতাম, কিন্তু মনে হলো শিক্ষক মানুষ হিসেবে মামা আরও সুন্দর করে লিখে দিতে পারবেন। তিনি আবেদনপত্র লিখে দিলেন। পরে সেটি নিয়ে আবার চাঁদপুর প্রবাহ অফিসে গেলাম। শোভন ভাই আবেদনটি গ্রহণ করলেন এবং আমাকে তৎকালীন সম্পাদক মাকসুদ আলম ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সেখান থেকেই শুরু হয় আমার সাংবাদিকতা ও লেখালেখির আনুষ্ঠানিক যাত্রা।
এরপর যখনই চাঁদপুরে আসতাম, এলাকার বিভিন্ন সমস্যা, সম্ভাবনা ও জনদুর্ভোগ নিয়ে সংবাদ লিখে নিয়ে আসতাম। সঙ্গে থাকত আমার ছড়া ও কবিতা। অনেক সময় ডাকযোগেও লেখা পাঠাতাম। আবার আমাদের এলাকার পরিচিত কেউ চাঁদপুর কোর্টে গেলে তাঁদের হাতে খামে ভরে সংবাদ দিয়ে বলতাম, “কষ্ট করে তালতলায় চাঁদপুর প্রবাহ অফিসের ডাকবক্সে রেখে আসবেন।”
পরদিন পত্রিকায় নিজের লেখা বা কবিতা প্রকাশিত হলে যে আনন্দ অনুভব করতাম, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমার পাঠানো সংবাদগুলোর মধ্যে যেগুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো, শোভন ভাই সেগুলো আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয়ভাবে সম্পাদনা করে প্রকাশ করতেন। নিজের নাম ছাপা দেখে নতুন করে অনুপ্রেরণা পেতাম।
জরুরি বা দুর্ঘটনার সংবাদ হলে আমি দ্রুত ফোন করে শোভন ভাইকে বিষয়টি জানাতাম। কখনো তিনি নিজেই তথ্য লিখে নিতেন, আবার অনেক সময় আগে থেকেই খবর পেয়ে আমাকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দিতেন। এভাবেই মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার বাস্তব শিক্ষা নিতে শুরু করি।
পরবর্তীতে তিনি আমাকে ই-মেইলে সংবাদ পাঠানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু তখন আমাদের এলাকার বাজারে কোনো কম্পিউটারের দোকান ছিল না। তাই নারায়ণপুর বাজার, মতলব বাজার কিংবা হাজীগঞ্জে গিয়ে কম্পিউটারের মাধ্যমে সংবাদ ই-মেইল করতাম। সময় পেলেই অফিসে গিয়ে সংরক্ষিত পত্রিকা থেকে নিজের প্রকাশিত সংবাদ সংগ্রহ করতাম। শোভন ভাই প্রতিটি সংবাদ নিয়ে পরামর্শ দিতেন- কীভাবে লিখতে হবে, কার বক্তব্য নিতে হবে, কীভাবে সংবাদকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য করা যায়। সত্যি বলতে, সাংবাদিকতার হাতে-কলমে অনেক কিছুই আমি তাঁর কাছ থেকে শিখেছি।
দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহের পাশাপাশি চাঁদপুরের জনপ্রিয় অনুসন্ধানী সাপ্তাহিক মানবসমাজ পত্রিকাতেও কাজ করার সুযোগ হয়। তখন নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন মনিরুজ্জামান বাবলু। তাঁর কাছ থেকেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নানা দিক শেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
পরবর্তীতে কর্মজীবনের প্রয়োজনে ঢাকায় চলে আসি। সেখানে সরকারি মিডিয়া তালিকাভুক্ত দৈনিক এশিয়া বানী পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর কাজ করেছি দৈনিক জনতা এবং নাঈমুল ইসলাম খানের দৈনিক আমাদের সময়-এ। পরে নতুন প্রকাশিত দৈনিক মাতৃভূমির খবর পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দিই এবং পরবর্তীতে দীর্ঘদিন সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।
সাংবাদিকতা জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন স্বপ্ন দেখায়। সেই স্বপ্ন থেকেই ২০১৫ সালে সিনিয়র সহকর্মীদের পরামর্শে সাপ্তাহিক পাঠক সংবাদ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করি। প্রয়োজনীয় সরকারি ঘোষণা (ডিক্লারেশন) লাভের পর পত্রিকাটি প্রকাশ শুরু হয়। আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং পাঠকদের ভালোবাসায় আজও সাপ্তাহিক পাঠক সংবাদ সুনামের সঙ্গে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে।
পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, তালতলার একটি ছোট্ট পত্রিকা অফিসে সাহস করে প্রবেশ করার সেই দিনটিই আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল। সেই একটি পদক্ষেপই আমাকে একজন স্বপ্নবাজ তরুণ লেখক থেকে সাংবাদিক, সম্পাদক এবং একটি পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদকের দীর্ঘ পথচলার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। এই যাত্রাপথে যাঁরা আমাকে হাতে ধরে শিখিয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন এবং বিশ্বাস করেছেন- তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
লায়ন মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি
সাংবাদিক ও লেখক
সম্পাদক, সাপ্তাহিক পাঠক সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক, এবিসি বাংলা













