স্মৃতির পাতায় বদরপুর | মো: সাইফুল ইসলাম রণি
- আপডেট সময় : ০১:৩৫:৪৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
আমাদের ছোট্ট একটি গ্রাম, নাম তার বদরপুর। এটি ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার ৪ নং নারায়ণপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। সবুজ শ্যামল প্রকৃতির কোমল ছায়ায় ঘেরা, মাটির সোঁদা গন্ধে মাখামাখি এক মায়াবী জনপদ। এই গ্রামের বুকেই ছড়িয়ে আছে আমার শৈশব, কৈশোর, দুরন্তপনা আর ফেলে আসা হাজারো স্মৃতির গল্প। এখানে ভোরের বাতাসে মিশে থাকে মাটির ঘ্রাণ, গাছের পাতায় পাতায় জেগে ওঠে নতুন দিনের গান, আর পাখির কলতানে ঘুম ভাঙে নিস্তব্ধ প্রকৃতির।
সেই দিনগুলো আজও চোখ বুজলেই ফিরে আসে।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে পড়তাম জোড়পুল বাজারের পথে। পথের দুপাশে সবুজের সমারোহ, পরিচিত মানুষের মুখ, কারও মুখে হাসি, কারও কণ্ঠে স্নেহভরা ডাক। মনে হতো, এ গ্রাম শুধু কয়েকটি বাড়ি আর কিছু মেঠোপথের নাম নয়, এ যেন ভালোবাসার এক বিশাল পরিবার। যেখানে সবাই কাউকে না কাউকে চেনে, যেখানে মানুষের সম্পর্কের বাঁধন ছিল মায়ায় জড়ানো, আন্তরিকতায় ভরা।
শীতের সকালগুলো ছিল আরও মায়াবী। চারদিকে ঘন কুয়াশার চাদর, দূরের গাছপালাগুলোকে মনে হতো ধোঁয়াটে কোনো স্বপ্নের অংশ। সবুজ ঘাসে জমে থাকা শিশিরবিন্দু মুক্তোর মতো ঝলমল করত। মাঠের পর মাঠ, ফসলের জমি আর কুয়াশায় ঢাকা সরু পথ পেরিয়ে ভেসে আসত গ্রামের চেনা শব্দ। সেই শীতের সকালে প্রকৃতির বুকজুড়ে যে স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে থাকত, আজ দুর প্রবাসের বাড়িতে দাঁড়িয়েও তার তুলনা খুঁজে পাই না। মনে হয়, আহা! আর একবার যদি ফিরে যেতে পারতাম সেই শিশিরভেজা ভোরে, আর একবার যদি হাঁটতে পারতাম বদরপুর গ্রামের মেঠোপথে।
সকালের আরেকটি চেনা ছবি ছিল মায়ের ডাক।
মা ডাকতেন, “ওঠ, জোড়পুল যেতে হবে, বাজার আনতে ।” সেই ডাকে ছিল দায়িত্বের তাগিদ, ছিল সংসারের ব্যস্ততা, আর ছিল সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। তখন বুঝতাম না, মায়ের প্রতিটি ডাকের ভেতরে কত মায়া লুকিয়ে থাকে। আজ বুঝি, সেই ডাকগুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়, সবচেয়ে আপন সুর।
আর বাবার কথা কী বলব!
ফজরের আজান হওয়ার আগেই বাবা ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন। নামাজ পড়তে হবে, মসজিদে যেতে হবে- এ ছিল তাঁর কঠোর নির্দেশ। কিন্তু ঘুমে তখন চোখ খুলতে চাইত না। বাবা বারবার ডাকতেন, আর আমি লেপের নিচে মুখ লুকিয়ে পড়ে থাকতাম। শেষমেশ বাবা যখন লাঠি হাতে এগিয়ে আসতেন, তখন আর উপায় কী! এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়তাম। তাড়াহুড়ো করে অজু করে ছুটতাম নামাজের দিকে।
শৈশবের দুষ্টুমিও কম ছিল না। কখনো কখনো নামাজ না পড়েই বাড়ি ফিরে এসে বলতাম, “নামাজ পড়ে এসেছি।” তখন মনে হতো, বুঝি বাবাকে ফাঁকি দিতে পেরেছি! অথচ আজ সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়লে নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। বাবার সেই শাসন, সেই লাঠি হাতে নিয়ে ভয় দেখানো , সেই ভোরের ঘুম ভাঙানো- সবকিছুই আজ বড় আপন মনে হয়। এখন বুঝি, তাঁর কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল আমাদের মানুষ করে তোলার এক গভীর স্বপ্ন।
বাবার পেশা ছিল শিক্ষকতা।পাশাপাশি আমাদের জোড়পুল বাজারে বাবার একটি দোকানও ছিল। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি দোকান চালাতেন। মাঝে মাঝে বাবা বিদ্যুৎ অফিসের কাজে আলীগঞ্জ, চাঁদপুর ও মতলব যেতেন। তখন আমাকে দোকানে বসিয়ে রেখে যেতেন। আমি ছিলাম বাবার একমাত্র সন্তান। দোকানে বেচাকেনা করতে করতে বাবাকে না জানিয়ে যখন ইচ্ছা, তখনই পকেট খরচ নিয়ে নিতাম। বাবার ক্যাশে সব সময় টাকা থাকত। বাবা টের পেলেও কোনো দিন জিজ্ঞেস করতেন না, আমি সেখান থেকে টাকা নিয়েছি কি না।
আজ সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বাবার প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হয়ে ওঠে। তখন হয়তো বুঝতে পারিনি, বাবার এই নীরবতার আড়ালে কতটা স্নেহ আর মমতা লুকিয়ে ছিল। তিনি হয়তো সবই বুঝতেন, তবু কিছু বলতেন না। বাবার সেই নীরব প্রশ্রয়, সেই নিঃশব্দ ভালোবাসা আজ আমার জীবনের অমূল্য স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কত কিছু বদলে গেছে, কিন্তু বাবার সঙ্গে কাটানো সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো আজও হৃদয়ের গভীরে অমলিন হয়ে আছে।
তারপর স্কুলে যাওয়ার পালা। মায়ের হাতে সকালের গরম ভাত খেয়ে বইখাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম স্কুলের পথে। মায়ের রান্না করা সেই ভাতের স্বাদ আজও যেন জিভে লেগে আছে। তখন মনে হতো, প্রতিদিনই তো খাই! অথচ আজ বুঝি, মায়ের হাতের সেই ভাত শুধু খাবার ছিল না, ছিল ভালোবাসার উষ্ণতা, ছিল মায়ের আঁচলে জড়িয়ে থাকা এক টুকরো পৃথিবী।
স্কুলের দিনগুলোও ছিল কত রঙিন, কত দুষ্টুমিতে ভরা!
পড়াশোনার চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার প্রতি আকর্ষণ ছিল কখনো কখনো বেশি। ক্লাস চলতে চলতে কখনো মন পড়ে থাকত মাঠে, কখনো গ্রামের অন্য কোনো জায়গায়। ছুটির ঘণ্টা বাজার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একসময় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেত। কোনো কোনো দিন স্যারদের কিছু না বলেই চুপিসারে স্কুল থেকে পালিয়ে যেতাম। তারপর বন্ধুদের সঙ্গে অন্য কোথাও বসে আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা আর দুষ্টুমিতে কেটে যেত সময়। স্কুল ছুটির সময় হলে বাড়ি ফিরতাম এমন ভাব নিয়ে, যেন কিছুই হয়নি!
সেই দিনগুলোতে সময়ের কোনো হিসাব ছিল না। ছিল না জীবনের কঠিন অঙ্ক, ছিল না ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা। ছিল শুধু বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি, মাঠের পথে ছুটে চলা, বাড়ি ফেরার তাড়া আর পরদিন আবার দেখা হওয়ার প্রতিশ্রুতি। তখন বুঝিনি, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোই নীরবে আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
আজ কত হাজারো মাইল পেরিয়ে এসেছি। জীবনের প্রয়োজনে বদলেছে ঠিকানা, বদলেছে ব্যস্ততা, বদলেছে চারপাশের অনেক কিছু। কিন্তু বদলায়নি আমার প্রিয় জন্মভূমি বদরপুর গ্রামের প্রতি আমার ভালোবাসা। আজও স্মৃতির দরজা খুললেই ফিরে পাই সেই মাটির গন্ধ, শীতের সকালের কুয়াশা, শিশিরভেজা সবুজ ঘাস, জোড়পুল বাজারের চেনা মুখ আর বাবার সঙ্গে হেঁটে চলা সেই পথ।
মনে পড়ে মায়ের ডাক, বাবার শাসন, বন্ধুদের সঙ্গে স্কুল পালানোর গল্প। মনে পড়ে গরম ভাতের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ঘর, ভোরের আজান, মসজিদে যাওয়ার তাড়া আর বিকেলবেলার অবাধ আনন্দ।
আহা, কী সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো!
তখন বুঝিনি, সুখ আসলে কত সাধারণ জিনিসের মধ্যে লুকিয়ে থাকে। একটি মায়ের ডাক, বাবার হাত ধরে বাজারে যাওয়া, বন্ধুর সঙ্গে নির্ভার হাসি, কুয়াশায় ঢাকা গ্রামের পথ কিংবা মাটির ঘরে বসে মায়ের হাতের গরম ভাত খাওয়া- এসবই যে একদিন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে, তা কে জানত!
আজও মনে মনে ফিরে যাই আমার সেই ছোট্ট গ্রামে।
মনে হয়, একবার যদি আবার সেই ভোরে ঘুম ভাঙত, আবার যদি বাবার ডাকে বিছানা ছেড়ে উঠতাম, আবার যদি মায়ের হাতের গরম ভাত খেয়ে স্কুলে যেতাম! আবার যদি বন্ধুদের সঙ্গে স্কুল পালিয়ে নির্ভার দুপুর কাটাতে পারতাম!
কিন্তু সময় তো আর পেছনে ফেরে না। শৈশবের দিনগুলো ফিরে আসে না, ফিরে আসে শুধু স্মৃতি। আর সেই স্মৃতির প্রতিটি পাতায় লেখা আছে আমার বদরপুরের নাম।
বদরপুর শুধু আমার জন্মভূমি নয়, বদরপুর আমার শৈশব, আমার শেকড়, আমার অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পৃথিবীর যত প্রান্তেই যাই, যত দূরেই থাকি, হৃদয়ের গভীরে চিরকাল বেঁচে থাকবে আমার সেই ছোট্ট গ্রাম- সবুজ শ্যামল, মায়ায় ঘেরা, মাটির গন্ধে ভরা প্রিয় বদরপুর।
লায়ন মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি
সাংবাদিক ও লেখক
সম্পাদক, সাপ্তাহিক পাঠক সংবাদ










