ঢাকা ০২:৫২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অননুমোদিত মাদরাসা: শিশু নিরাপত্তা ঝুঁকিতে | মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০০:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ২০৮ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

লেখার শুরুতেই সবার কাছে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি কামনা করছি। কেউ কেউ হয়তো শিরোনাম দেখেই মনে করতে পারেন বাংলাদেশে৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে মাদরাসা শিক্ষা কিংবা আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে বুঝি এ লেখা। কিন্তু বিষয়টি মোটেও তা নয়। বরং আমার এ লেখার উদ্দেশ্য মাদরাসা শিক্ষা বা আলেম-ওলামাদের প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়, উদ্দেশ্য হলো-শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় শিক্ষার নামে গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত ও অননুমোদিত কিছু প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষা আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অসংখ্য আলেম-ওলামা ও শিক্ষক নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে আসছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। তাই কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের অপরাধ বা কিছু শিক্ষকের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় পুরো মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপানো কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

তবে বাস্তবতা হলো, রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা ও গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বাড়ি, ফ্ল্যাট কিংবা ভবন ভাড়া নিয়ে অনুমোদন ও যথাযথ তদারকি ছাড়াই অনেক ছোট ছোট নূরানি, হেফজ ও কওমি মাদরাসা পরিচালিত হচ্ছে-এমন অভিযোগ ও বিভিন্ন ঘটনার খবর প্রায়ই সামনে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের সবগুলো যে অনিয়ম করছে, তা নয়। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষা পরিবেশ, শিক্ষক নিয়োগ, আবাসিক ব্যবস্থা ও জবাবদিহির যথাযথ ব্যবস্থা নেই, সেগুলো নিয়ে এখনই ভাবার সময় এসেছে।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে মাঝে মাঝে শিশু নির্যাতন, শারীরিক শাস্তি এবং যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ অভিযোগের খবর আমরা দেখতে পাই। কোনো শিক্ষক যদি একটি শিশুকে এমনভাবে মারধর করেন, যেন সে কোনো অপরাধী বা শত্রু-তাহলে সেটি শিক্ষা নয়, সেটি শিশুর প্রতি নির্মম আচরণ। আবার কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি আরও ভয়াবহ। কারণ একজন শিশু তার শিক্ষককে বিশ্বাস করে, অভিভাবকও সন্তানের নিরাপত্তার জন্য শিক্ষকের ওপর আস্থা রাখেন।

একটি শিশু যখন আবাসিক মাদরাসায় থাকে, তখন তার বড় একটি সময় কাটে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও দায়িত্বশীলদের তত্ত্বাবধানে। সেখানে যদি নিরাপদ পরিবেশ না থাকে, তাহলে শিশুটির শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অতিরিক্ত ভয়, অপমান, মারধর কিংবা নির্যাতনের অভিজ্ঞতা একটি শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে।
তাই সরকারের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান

মাদরাসা বন্ধ নয়, বরং মাদরাসা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করুন।
যে কোনো আবাসিক নূরানি, হেফজ, কওমি বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, আবাসিক ব্যবস্থা, শিক্ষক ও কর্মচারীদের পরিচয় যাচাই, শিশু সুরক্ষা নীতি, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিদর্শনের মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারি-বেসরকারি সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো এসব আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামো থাকা দরকার। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি বা দায়িত্বশীল তদারকি ব্যবস্থা থাকতে পারে, যারা নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, খাবার, আবাসন, চিকিৎসা, পড়াশোনা ও শিক্ষকদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করবে।

একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও যথাযথ যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। শুধু ধর্মীয় জ্ঞান থাকলেই একজন ব্যক্তি শিশুদের আবাসিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত হয়ে যান না। শিশুদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয়, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সম্পর্কে কী ধারণা থাকা প্রয়োজন এবং শিশু সুরক্ষা সম্পর্কে কী দায়িত্ব রয়েছে—এসব বিষয়েও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুকে শাসন করা আর শিশুকে নির্যাতন করা এক বিষয় নয়।

ভুল করলে শিশুকে বোঝাতে হবে, প্রয়োজন হলে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে; কিন্তু মারধর, অপমান, ভয় দেখানো কিংবা নিষ্ঠুর আচরণ কোনোভাবেই শিক্ষার অংশ হতে পারে না।
এখানে অভিভাবকদের দায়িত্বও কম নয়। সন্তানকে শুধু মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কোথায় ভর্তি করাচ্ছেন, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও পরিবেশ কেমন, শিক্ষকরা কারা, আবাসিক ব্যবস্থা নিরাপদ কি না-এসব যাচাই করা জরুরি।

সম্ভব হলে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে আবাসিক ব্যবস্থার পরিবর্তে অনাবাসিক প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। আর সন্তান আবাসিক মাদরাসায় থাকলে নিয়মিত তার সঙ্গে কথা বলতে হবে, তার আচরণ ও মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করতে হবে। হঠাৎ অতিরিক্ত ভয় পাওয়া, চুপচাপ হয়ে যাওয়া, প্রতিষ্ঠানে যেতে না চাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ করলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, কোনো শিশুর অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।

আমরা চাই আমাদের সন্তানরা কোরআন শিখুক, হাদিস শিখুক, ইসলাম সম্পর্কে জানুক, নৈতিক ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। কিন্তু সেই শিক্ষা কখনোই ভয়, নির্যাতন কিংবা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে হতে পারে না।

ইসলামের শিক্ষা শান্তি, মানবিকতা, ন্যায় ও কল্যাণের শিক্ষা। তাই ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হতে হবে নিরাপদ, মানবিক ও আদর্শের জায়গা।

কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে যেন মানুষ মাদরাসা শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে না নেয়, আলেম-ওলামাদের প্রতি আস্থা হারিয়ে না ফেলে-এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেমন, তেমনি দায়িত্বশীল আলেম সমাজ, মাদরাসা পরিচালনা কমিটি এবং অভিভাবকদেরও।
আমরা মাদরাসা চাই। আমরা চাই আমাদের সন্তানরা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করুক। আমরা চাই আরও বেশি আলেম তৈরি হোক। কিন্তু তার আগে চাই

প্রতিটি শিশু নিরাপদ থাকুক।

রাষ্ট্রের উচিত অননুমোদিত ও অনিয়ন্ত্রিত আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি কার্যকর নীতিমালার আওতায় আনা, নিয়মিত পরিদর্শন করা এবং শিশু নির্যাতন বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করা।
কারণ একটি শিশুর কান্না কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম দিয়ে চাপা দেওয়া যায় না।

মাদরাসা হোক, ধর্মীয় শিক্ষা হোক-কিন্তু শিশুর নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস নয়।

আজকের শিশু আগামী দিনের আলেম, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক। তাদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়-এটি সমাজ ও রাষ্ট্রেরও নৈতিক দায়িত্ব।

লায়ন মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি
সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক
সম্পাদক, সাপ্তাহিক পাঠক সংবাদ

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

অননুমোদিত মাদরাসা: শিশু নিরাপত্তা ঝুঁকিতে | মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি

আপডেট সময় : ০৮:০০:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

লেখার শুরুতেই সবার কাছে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি কামনা করছি। কেউ কেউ হয়তো শিরোনাম দেখেই মনে করতে পারেন বাংলাদেশে৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে মাদরাসা শিক্ষা কিংবা আলেম-ওলামাদের বির