সাংবাদিকতা রাজনীতির ছায়ায়
- আপডেট সময় : ০৫:০২:২২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭১ বার পড়া হয়েছে
সাংবাদিকতা হচ্ছে একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা, সত্যকে সত্য হিসেবে প্রকাশ করা এবং সাধারণ মানুষের কথা সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে সাংবাদিকদের একটি অংশ সরাসরি কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছেন- যা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগের বিষয়।
একসময় সাংবাদিকরা রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হলেও প্রকাশ্য দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক ছিলেন। সাংবাদিকতার পরিচয়টিই ছিল তাঁদের প্রধান পরিচয়। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র এখন বদলে গেছে । এখন অনেক সাংবাদিককে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে দেখা যায়। কেউ দলীয় পদ- পদবি গ্রহণ করছেন, কেউ আবার রাজনৈতিক পরিচয়কে নিজের পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলছেন।
রাজনীতি করা সবার ব্যক্তিগত অধিকার-এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন নাগরিক হিসেবে একজন সাংবাদিকেরও রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তাঁর সাংবাদিকতার দায়িত্ব ও নিরপেক্ষতাকে কতটা প্রভাবিত করছে?
সাংবাদিক যখন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত হয়ে পড়েন, তখন সংবাদ পরিবেশনে নিরপেক্ষতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। যে সংবাদটি জনগণের সামনে সত্য হিসেবে তুলে ধরার কথা, সেখানে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সংবাদ আর সংবাদ থাকে না, হয়ে ওঠে পক্ষপাতদুষ্ট প্রচারণার হাতিয়ার।
আরও দুঃখজনক হলো- কিছু সাংবাদিক রাজনৈতিক সুবিধা, পদ-পদবি কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের আশায় ক্ষমতাবানদের প্রশংসা ও তোষামোদে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সাংবাদিকতার শক্তি যেখানে প্রশ্ন করার মধ্যে, সেখানে কেউ কেউ প্রশ্ন করার বদলে প্রশংসা করাকেই নিরাপদ পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এভাবে ধীরে ধীরে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি একজন সাংবাদিকের পেশাগত বিবেকও দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর ফল কিন্তু শুধু সাংবাদিকদের ওপর পড়ে না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সাংবাদিকতা পেশা। সাধারণ মানুষের একটি অংশ তখন সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ সংবাদকর্মী হিসেবে না দেখে দলীয় পক্ষের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। কোথাও কোথাও সাংবাদিকদের নিয়ে ‘দলীয় চাটুকার’ কিংবা ‘দলীয় মুখপাত্র’-এ ধরনের নেতিবাচক মন্তব্যও শোনা যায়। এটি সাংবাদিক সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে বিব্রতকর।
সাংবাদিকের কলম কোনো দলের মুখপাত্র হওয়ার জন্য নয়। সাংবাদিকের কলম অন্যায় দেখলে প্রশ্ন করবে, অনিয়ম দেখলে তুলে ধরবে, নিপীড়িতের কথা বলবে এবং ক্ষমতাবানকেও জবাবদিহির আওতায় আনবে। একটি সংবাদ যদি কারও পছন্দের হয়, তবুও তা সত্য হলে প্রকাশ করতে হবে, আবার নিজের অপছন্দের হলেও সত্য হলে সেটিও প্রকাশ করতে হবে। এটাই সাংবাদিকতার নৈতিক শক্তি।
আমরা যদি সাংবাদিকতাকে দলীয় আনুগত্যের বাইরে রাখতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্ন ও স্বাধীন সাংবাদিকতা বড় ধরনের সংকটে পড়বে। সাংবাদিকদের প্রতি মানুষের যে আস্থা ও সম্মান রয়েছে, সেটিও ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। কারণ সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাস যোগ্যতা <। আর বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে তা ফিরে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
তাই সময় এসেছে আত্মসমালোচনার। আমরা কি রাজনৈতিক দলের কর্মী হতে চাই, নাকি সত্যের অনুসন্ধানী সাংবাদিক হতে চাই? আমরা কি ক্ষমতাবানদের প্রশংসা করে ব্যক্তিগত সুবিধা নিতে চাই, নাকি সাধারণ মানুষের অধিকার ও সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে চাই?
রাজনীতি যার যার ব্যক্তিগত অধিকার। কিন্তু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে- সাংবাদিকের প্রথম পরিচয় সাংবাদিক, কোন দলের কর্মী না বা মুখপাত্র নয়।
আসুন, আমরা রাজনৈতিক তোষামোদ ও ব্যক্তিস্বার্থের সাংবাদিকতা থেকে বেরিয়ে আসি। ফিরে আসি পরিচ্ছন্ন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতায়। আমাদের কলম হোক সত্যের পক্ষে, আমাদের সংবাদ হোক মানুষের কথা বলার মাধ্যম এবং আমাদের সাংবাদিকতা হোক বিবেক, নীতি ও দায়িত্ববোধের প্রতিচ্ছবি।
লায়ন মো: সাইফুল ইসলাম রণি
সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক












