রাজনীতির ঊর্ধ্বে কলমের স্বাধীন পরিচয়
- আপডেট সময় : ০৩:২৮:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ৫৫ বার পড়া হয়েছে
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা। একজন সাংবাদিক কিংবা লেখক রাজনৈতিক দলের নেতা হতে পারেন কি না, সেটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। তবে আমার বিশ্বাস, যাঁরা সাংবাদিকতা, লেখালেখি, সাহিত্য-সংস্কৃতি কিংবা শিল্পচর্চার সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের উচিত দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থেকে নিজের অবস্থান বজায় রাখা। কারণ তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট দলের নন, তাঁরা সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের।
একজন সাংবাদিকের কাছে সরকারি দল, বিরোধী দল, সাধারণ মানুষ, ধনী-গরিব, অবহেলিত ও নিপীড়িত- সবাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কলম কথা বলবে সত্যের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়। কিন্তু যখন একজন সাংবাদিক নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয়, পদবি কিংবা সাইনবোর্ড ব্যবহার করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
সম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত অনেক সাংবাদিক বন্ধু রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, দলীয় প্রচার- প্রচারণা এবং রাজনৈতিক পদ-পদবি গ্রহণের প্রবণতা চোখে পড়ছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এমপি-মন্ত্রীদের দপ্তরে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন। আবার কেউ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দপ্তরে চুক্তিভিত্তিক পদ কিংবা মন্ত্রীদের সহকারী হওয়ার প্রত্যাশায় রাজনৈতিক বলয়ে সক্রিয় হচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, এসব কর্মকাণ্ড সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে কতটা অক্ষুণ্ণ রাখছে?
আমি যখন ২০০৫ সালে গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হই। সেই সময়ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ একেবারে ছিল না, তা বলব না। তবে বর্তমান সময়ের মতো এমন প্রবণতা এতটা চোখে পড়ত না।
আমার কাছে মনে হয়, সাংবাদিক, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, অভিনয়শিল্পী ও খেলোয়াড়দের একটি আলাদা সামাজিক মর্যাদা রয়েছে। তাঁরা সমাজের সব মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন। যে সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকুক, তাঁদের উচিত সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে বুক উঁচু করে দাঁড়ানো। সরকার পরিবর্তন হলেও তাঁদের সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা যেন অটুট থাকে।
আরেকটি বিষয় আমাকে ভাবায়। সাংবাদিকদের মধ্যে এত বিভাজন কেন? একই পেশার মানুষের জন্য এত সংগঠন, এত গ্রুপিং, এত কোন্দল কেন? সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সাংবাদিকরা রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন, ব্যক্তিগত সুবিধার আশায় তোষামোদ করছেন। মফস্বল সাংবাদিকতার বাস্তবতা আরও কঠিন। সেখানে পেশাগত নিরাপত্তা, সম্মান ও আর্থিক নিশ্চয়তার অভাবের পাশাপাশি নানা ধরনের চাপ ও প্রভাবের মুখোমুখি হতে হয় সাংবাদিকদের।
এমনকি রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে কোনো কোনো সাংবাদিককে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, দেশ ছাড়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে-এমন ঘটনাও আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
আমরা কি ভুলে যাচ্ছি, সাংবাদিকতা ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার সিঁড়ি নয়; বরং ক্ষমতাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার দায়িত্ব? সাংবাদিকের শক্তি তাঁর কলম, তাঁর পরিচয় কোনো রাজনৈতিক পদবি নয়। একজন লেখকের শক্তি তাঁর চিন্তা, একজন কবির শক্তি তাঁর সৃজনশীলতা।
আসুন, আমরা ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় মোহ, পদ-পদবি ও তোষামোদের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসি। সাংবাদিকতা ও সাহিত্য-সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা করি। রাজনৈতিক মতাদর্শ যার যার ব্যক্তিগত বিষয় হতে পারে, কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, সততা ও সাহসিকতাই হোক আমাদের মূল পরিচয়।
মনে রাখতে হবে, সাংবাদিক কোনো দলের মুখপাত্র নন; তিনি জনগণের কণ্ঠস্বর। তাঁর কলম কোনো দলের স্বার্থে নয়, সত্যের পক্ষে এবং মানুষের জন্য পরিচালিত হওয়াই কাম্য।
লায়ন মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি
সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক









